014

মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় অতিরিক্ত মাত্রায় সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে উল্লেখ করে এখনই তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে পরিষদের সভাপতি ইথিওপিয়ার তেকেদা আলেমু এক বিবৃতিতে এ কথা জানান। বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করে বেসামরিক জনগণ ও ‘শরণার্থী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

বৈঠক প্রসঙ্গে জাতিসংঘে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত কার্ল স্কু বলেছেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার বিষয়ে এক সুরে কথা বলেছে। তারা গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহযোগিতার সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং শরণার্থী সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। ’

নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি বলেন, পরিষদের সদস্যরা গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং যে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত তিন লাখ ৭০ হাজার লোকের বাস্তুচ্যুতি হয়েছে তার নিন্দা জানিয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ অনতিবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমন, আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও শরণার্থী সমস্যা সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের সহায়তা দেওয়ার প্রচেষ্টা এবং জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোর তত্পরতাকেও নিরাপত্তা পরিষদ স্বাগত জানিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, মিয়ানমার ত্রাণকর্মীদের রাখাইনে ঢুকতে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। বিবৃতিতে মিয়ানমারকে সেই অঙ্গীকার রক্ষা ও ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা করাকেও উত্সাহিত করেছে।

নিরাপত্তা পরিষদ রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিষদ রাখাইন রাজ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের গুরুত্বকে স্বীকার করেছে। ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার গতকাল যে কমিটি গঠন করেছে তাকেও স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।

সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারকে রাখাইনে সামরিক অভিযান থামাতে বলেছে কি না। জবাবে পরিষদের সভাপতি বলেছেন, পরিষদের সদস্যরা যে বিবৃতিটি দিতে রাজি হয়েছেন সেটিই তিনি পড়েছেন।

এদিকে বৈঠকের আগে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ এনেছেন। তিনি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে রাখাইনে সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড থামাতে এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে জোরালো আহ্বান জানান।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন গত সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বলেছিলেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও মিলিশিয়া জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। যায়ীদ রা’দ আল হুসেইনের ওই বক্তব্য জাতিসংঘ মহাসচিব সমর্থন করেন কি না জানতে চাইলে জাতিসংঘ মহাসচিব গত রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে তখন আপনাদের কাছে এর (জাতিগত নিধনযজ্ঞ) চেয়ে যথার্থ শব্দ আর কী আছে?’ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দৃঢ় ভাষায় বলেন, রাখাইনে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের নেতারাই রাখাইনে গণহত্যা ও জাতিগত নিধন বিষয়ে সরব হবেন বলে জানা যাচ্ছে। রাখাইন পরিস্থিতি ইতিমধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে বলেই মনে করছে বিশ্ব সম্প্রদায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এ নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে যুক্তরাজ্য ও সুইডেন জরুরি বৈঠকে বসার অনুরোধ জানিয়েছিল।

গত রাতে বৈঠকের আগে জাতিসংঘে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ রায়ক্রফ্ট এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘রাখাইন পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে। সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও লাখ লাখ মানুষের পালানোর খবর আসছে। যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেছে। ’

এর আগে গত ৩০ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো ফল ঘোষণা করা হয়নি। তবে নিউ ইয়র্কের কূটনীতিকরা বলেছেন, গত ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত আলোচনায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। সেই আলোচনার দুই সপ্তাহের মধ্যে একই ইস্যুতে জরুরি বৈঠকে আলোচনা করা বিদ্যমান পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই প্রতিফলন। এবারের বৈঠকের প্রাক্কালে মিয়ানমার সরকার দ্রুত আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য সরকারই ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের বিরোধী।

কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলে আসছে, রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চলছে। তিন হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে থেকেই বাংলাদেশে আছে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। বাংলাদেশের আশা, জাতিসংঘ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে যাচ্ছেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলবেন। এর পাশাপাশি সম্ভাব্য সব ফোরামে তিনি এ সংকট মোকাবেলায় বৈশ্বিক জোরালো সমর্থন চাইবেন।

এর আগে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকায় কূটনৈতিক সম্প্রদায়কে ব্রিফ করেছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখাতে সরকার বিদেশি রাষ্ট্রদূত বা মিশনপ্রধানদের গতকাল কক্সবাজার নিয়ে গেছে। বিদেশি সাংবাদিকদের কক্সবাজারে গিয়ে অবাধে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ।

গত তিন সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য যে সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশে ঢুকেছে তা যেকোনো দেশের জন্য অনেক বড় বোঝা। রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিকে বিশ্ব আর কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতে পারে না। আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠী সেখানে জাতিগত নিধনের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদের উসকানি দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে তা পুরো অঞ্চল তথা বিশ্বের জন্যই হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

গত মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ, তুরস্ক, ইরান, আলজেরিয়া, জর্দান, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, আফগানিস্তান, সেনেগালসহ বেশ কিছু দেশ প্রায় অভিন্ন সুরে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানায়।

এদিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সহযোগিতা দিচ্ছে ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। ভারতীয় ত্রাণ সহায়তার প্রথম চালান আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে সেটি বুঝিয়ে দেবেন।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ইবরাহিম রাহিমপুরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশে আসছে। ওই দল ১৬০ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আসবে। ইরান রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা করবে বাংলাদেশের সঙ্গে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম বিশেষ ফ্লাইটে করে ১১০ টনেরও বেশি তাঁবু পাঠিয়েছেন। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা জেরিক্যান, ঘুমানোর পাটি, কম্বল, রান্নার সামগ্রীবোঝাই একটি ফ্লাইট পাঠিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো গতকাল জরুরি ত্রাণসামগ্রীবোঝাই ফ্লাইট পাঠানোর সময় মিয়ানমারকে অনতিবিলম্বে সহিংসতা থামাতে বলেছেন।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা