atif

হাতিরঝিলে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখনই ফোন। আব্বা সাধারণত বিকেলে ফোন করেন না। তার ফোনটাইম রাত কিংবা সকাল। রাতে এশার নামায পড়ে ফোন করবেন নয়তো খুব সকালে। সকালের ফোনে তিনি আমাকে প্রায়ই পান না। কারণ তখন আমার মধ্যরাত।

ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আব্বার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। 
-হ্যালো, জহির?
-জি আব্বা। স্লামালাইকুম। 
আব্বা সালামের উত্তর দিয়ে কেমন আছি জানতে চাইলেন।

তারপর কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি বললেন কথাটা
-তোমার জন্য একটা পাত্রীর খোঁজ পেয়েছি। তোমার কি সময় হবে বাড়ি আসার?

 পাত্রীর কথা শুনে বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এমন না যে এই প্রথম আব্বা পাত্রীর কথা বললেন। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই বলে আসছেন বিয়ে করার কথা। আমি হ্যাঁ-ও বলিনি, না-ও বলিনি। অবশ্য মা একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন-তোর পছন্দের কেউ কি আছে? তোর বাবা তোর জন্য পাত্রী দেখতে চায়। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসেছি।

সামনে স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি আছে একমাস। লম্বা ছুটি। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা হাতিরঝিলের ঝিরঝিরে বাতাস যে কোনো কারণেই হোক আমার মনটা অদেখা সেই পাত্রীর জন্য অস্থির হয়ে উঠল। আমি আব্বাকে বলে দিলাম
-সামনে স্কুল ছুটি আছে। আমি একমাস বাড়িতে থাকব। আপনি ডেট দিয়ে দেন।

ফোন ছাড়ার পরই রাশেদের টিপ্পনি
-কি মাম্মা, স্বাধীনতা আর রক্ষা করতে পারছিস না। 
তিশা বললো-
-আমাকে না বলছিলি, তুই আমাকে বিয়ে করবি? এখন আবার পাত্রীর পিছনে ছুটে মরছিস কেন?
জাহিদ একধাপ এগিয়ে বলল-
-আমার মনে হয় এইবার তোর হবে। এর আগে তো দুইবার ফেল মারছোস। 
বলেই হো হো করে হেসে উঠল। তার সঙ্গে সুর মেলালো অন্যরা।

খিলগাঁও গভঃ কলোনি হাইস্কুলে আমি ইংরেজি পড়াই। বিকেলে কোচিং। রাতে দুইটা টিউশনি। সকালে স্কুল। এই আমার গৎবাঁধা জীবন। বাড়িতে আব্বা-মা আর ছোটবোন রুনি। আমি বড়। বাড়তি কোনো ঝামেলা আপাতত নেই। বিয়েটা করা যেতে পারে। রাতে ঘণ্টাখানেক ভেবে সিন্ধান্ত— নিলাম-পাত্রী পছন্দ হলে সামনের মাসেই বিয়ে করব।

স্কুল ছুটির পরদিন বাড়ি গেলাম। কমলাপুর থেকে ট্রেন ছাড়ল সকাল ৬টা ২০ মিনিটে। উল্লাপাড়া নামিয়ে দিল ১০টা ৩০ মিনিটে। সেখান থেকে চৌবিলা পৌঁছতে লাগে আরো আধাঘণ্টা। মার কাছে শুনলাম, পাত্রীর খোঁজ এনেছে চাচাতো বোন শায়লার স্বামী হাসান ভাই। প্রাইম ব্যাংকে চাকরি করেন। সিনিয়র ম্যানেজার। অমায়িক ভদ্রলোক। আমাকে খুবই পছন্দ করে হাসান ভাই। গত বছর ঈদে বললেন-
-জহির, চাকরি তো করছো। এবার একটা বিয়ে-টিয়ে কর। তোমার পছন্দের কোনো মেয়েটেয়ে আছে?
আমি বললাম-
-বিয়ে করতে আমার কোনো আপত্তি নেই হাসান ভাই। কিন্তু টিয়ে করাটা কি ঠিক হবে?
আমার হালকা রসিকতাতেই হাসান ভাই গমগম শব্দ করে হাসতে শুরু করলেন। সেই হাসি আর থামে না। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন-
-এই জন্যই তোমাকে এত পছন্দ করি। সবসময় হাসিখুশি থাকো। রসিকতা করো। এমনতো আজকাল দেখাই যায় না। সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। তোমার জন্য আমি একটা পাত্রী পছন্দ করে দিই। কোনো আপত্তি নেই তো?
-আরে না হাসান ভাই। আপত্তি থাকবে কেন? বিয়ে তো একদিন করতেই হবে। আপনি দেখেন। মেয়ে পছন্দ হলে অবশ্যই বিয়ে করব।

বিকেলে হাসান ভাইকে ফোন দিলাম। পাত্রী তার বড় ভাইয়ের আপন শ্যালিকা। তিনি কথাবার্তা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। শুক্রবার দুই বন্ধু, রাশেদা খালা ও তার দুই মেয়েকে নিয়ে রওনা দিলাম পাত্রী দেখতে। পাত্রীর বাড়ি কাজীপুর গান্দাইলের বড়ইতলা। আগে কখনো যাওয়া হয়নি ওদিকে। দুই ঘণ্টা লাগল বড়ইতলা বাজারে পৌঁছতে। এতদূর শ্বশুরবাড়ি হতে যাচ্ছে মনে হতেই মনের ভিতর খচখচ করতে শুরু করল। পাত্রী দেখতে কী নেওয়া যায় চিন্তা করছি। খালা বললেন-
-কী আবার নিতে হবে। পাত্রী দেখা শেষে হাতের মধ্যে পাঁচশ টাকার একটা নোট দিলেই মামলা খতম। 
কথাটা বলার সময় খালার চোখে বুদ্ধির ঝলক খেলে গেল। খালার প্রস্তাবে তার দুই মেয়ে [রাফিয়া ও নিশু] ভেটো দিয়ে বলল-
-জহির ভাই, মার কথা শুনবা না। তুমি বাজার থেকে বেশি করে মিষ্টি কিনে নাও। এতগুলো মানুষ যাচ্ছি। আর খালি হাতে যাব।

আমি ছয় কেজি মিষ্টি ও চার কেজি দই কিনে দুই হাতে ঝুলিয়ে হবু শ্বশুরবাড়ির গেটে দিয়ে দাঁড়ালাম। গেট তো নয় যেন রাজপ্রাসাদ। এই যুগে এমন প্রাচীন আমলের গেট কেউ দেয়? বাইরে থেকে ভিতরে দেখার কোনো উপায় নেই। লোক এসেছে জানার পর ভেতর থেকে গেট খোলা হলো। আমরা কেন বাজারে নেমে একটা ফোন দিলাম না সে জন্য বারবার আক্ষেপ করতে লাগলেন প্রৌঢ়মতো এক লোক। তাকে বলতে শোনা গেল, মোতালেবের কাজটা কী? তাকে বারবার বলে দেওয়া হইছে বাজারে নতুন অতিথি দেখলে জিজ্ঞেস করে বাড়ি নিয়ে আসতে। একটা কাজ যদি হারামজাদারে দিয়ে ঠিকমতো হতো। বুঝতে পারলাম মোতালেবকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে আসতে পাঠানো হয়েছিল। সে কাজে ফাঁকি দিয়েছে। নয়তো আমাদের খুঁজে পায়নি।

বাড়ির পরিবেশ ও লোকলস্কর দেখে আমি মুগ্ধ। বড় খালার দুই মেয়ে রাফিয়া ও নিশু ইতিমধ্যে ভিতরবাড়িতে গিয়ে ডুবে গেছে। তাদের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করেছে তারা। এক ঘণ্টার মধ্যে এ বাড়ির হাড়ির খবর বড় খালার সামনে হাজির করা চাই।

দুপুরের পর বাড়ির ড্রইংরুমে গোল বসে বসলাম আমরা। শোনা গেল পাত্রী দেখানো হবে। আমার বুকের ধুকপুকানি ততক্ষণে আকাশ পৌঁছে গেছে। পানি পিপাশা লাগতে শুরু করল। ফ্যানের বাতাসেও ঘামতে লাগলাম। তখনই লাল বেনারশি জড়ানো এক মেয়েকে কয়েকজন সামনে এনে দাঁড়া করালো। বয়স্ক মতো এক প্রৌঢ়া বললেন-
-তানিয়া, সালাম দাও। 
পাত্রী চিকন কণ্ঠে সালাম দিল। আমি শুনতে পেলাম না। খালা বললেন-
-বসো মা। আমার কাছে এসে বস। 
একটু পরই তার ঘোমটা খোলা হলো। যেন নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করছি এমন উৎসাহে চোখ তুলে তাকালাম। ভেবেছিলাম আকাশের  হুরপরী দেখব। কিন্তু পাত্রীর সঙ্গে স্বপ্নে দেখা হুরপরীর কোনো মিল নেই। ফর্সা। টিকালো নাক। ছিপছিপে দেহ। এরকম মেয়ে প্রায়ই দেখা যায়। খালার ইন্টারভিউ পর্ব শেষ হতে এক ঘণ্টা লেগে গেল। পাত্রীর নানি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, পাত্রী পছন্দ হয়েছে কিনা?
খালা বললেন, আমাদের দেখা শেষ। সিদ্ধান্ত— এক সপ্তাহ পর জানিয়ে দেব।

বিকেলে পাত্রী মানে তানিয়ার তিনটা ছবি নিয়ে চলে আসলাম আমরা। আব্বা জানতে চাইলেন, পাত্রী পছন্দ কিনা? হাসান ভাই ঢাকা থেকে ফোন দিলেন। তারও জিজ্ঞাসা-কি জহির পাত্রী পছন্দ হইছে? আমি চুপ করে আছি। 
কি ব্যাপার কথা বলতেছো না কেন? পাত্রী পছন্দ হয় নাই? আমি বললাম, হাসান ভাই, এত তারাতারি সিদ্ধান্ত— নেওয়া ঠিক না। আমি একটু ভেবে দেখি।

এক সপ্তাহ ধরে রাত দিন তানিয়ার তিনটা ছবি নিয়ে পড়ে থাকি। সাধারণ একটা গ্রামের মেয়ে। স্থির থাকে ছবিতে। মনটা কী খারাপ করে ছবি তোলা। তিনটা ছবির একটাতেও তার হাসি নেই। সে কি হাসতে জানে না। যতবার ছবিটার দিকে তাকাই ততবারই মন খারাপ হয়। এমন একটা মেয়ে মন খারাপ করে থাকে কেন? মন খারাপ মানুষ দেখতে আমার মোটেও ভালো লাগে না। রাত গভীর হলে ভাবনায় দার্শনিকতা ভর করে। মোবাইলে তানিয়ার ছবি দেখি। এই মেয়েটার বাকি জীবন নির্ভর করছে আমার একটা হ্যাঁ অথবা না’র উপর। আমাদের তাদের পছন্দ আগেই জানা গেছে। পাত্রীরও কোনো আপত্তি নেই। এখন পাত্র রাজি হলেই হয়। রাজি হলে সে আমার বউ। না হলে অন্য কারো জন্য তার দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অপেক্ষা।

একদিন সাহস করে ফোন দিলাম তানিয়াকে। চিনতে পারল না। পরিচয় পেয়ে বলল, আপনি আমাকে ফোন করবেন স্বপ্নেও ভাবিনি। কেমন আছেন? কি সিদ্ধান্ত— নিলেন? অবশ্য আমি জানি আপনি আমাকে বিয়ে করবেন না। এর আগেও দুইজন পাত্র আমাকে দেখে গেছে। তারা পছন্দ করেনি। 
তানিয়ার সঙ্গে কথা বলে দেখি ভালো লাগছে। যাক, একটা পজিটিভ বিষয় অন্তত পাওয়া গেল। একটা না, দুইটা। তাদের পরিবার গ্রামের মধ্যে এক নামে চেনে। বেশ নামডাক আছে ওদের। নিজের জোরের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির জোর যুক্ত হলে ক্ষমতা বাড়ে। ক্ষমতা কে না চায়।

সাতদিন পর হাসান ভাইয়ের ফোন। কি ব্যাপার জহির, কিছুই তো জানালে না?
-হাসান ভাই, এই মেয়ে কী হাসতে জানে না?
-কেন, কি হইছে? কোনো ঝামেলা করেছে তোমার সাথে?
-আরে না, তিনটা ছবি দিছে। তার একটাতে হাসি নেই। এরকম গোমড়ামুখী মেয়ে আমার পছন্দ না।

গোমড়ামুখী শব্দটা শুনে হো হো করে হেসে দিলেন হাসান ভাই। বললেন, বুঝছি কোন জায়গায় জট লাগছে। তুমি এক ঘণ্টা অপেক্ষা করো আমি দেখছি। এক ঘণ্টা লাগল না। হাসান ভাই আধা ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকে তানিয়ার গোটা দশেক ছবি পাঠিয়ে দিলেন। ছবি দেখে বুকের মধ্যে ব্যথা করতে লাগল। এই মেয়ে হাসলে এত সুন্দর দেখায়। সামান্য হাসি একটা মেয়ের চেহারা এতটা বদলে দিতে পারে তানিয়ার এই ছবি না দেখলে আমি বিশ্বাসই করতাম না। বলা যায় আমার পৃথিবীই বদলে গেল। আমি পরদিন হাসান ভাইকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলাম।

পরের এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের দিন সন্ধ্যারাতে দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে দেওয়া হল। সবাই এসে দোয়া করে যাচ্ছেন। শালা-সমুন্দীও ভাবি জাতীয় আত্মীয়রা এসে খুনসুঁটি করে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে আমার মনেও দুষ্টুমি জেগে উঠল। তানিয়াকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে জানতে চাইলাম-
-তুমিই তো?
প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না সে। কয়েকবার মাথা ঝাকাল। তাতেই যে কী খুশির ঢেউ উঠল হৃদয়ে তা আজো ভুলতে পারি না। বারবার মনে হতে লাগল, এই মেয়েকে নিয়ে এক জনম নয়, শত জনম কাটিয়ে দেওয়া যায়।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা