মোমিনুল হক

চোখেমুখে গর্বিত ভাব। আর দশজন মায়ের মতোই ছেলেকে নিয়ে যে গর্বের শেষ নেই মুমিনুল হকের মা মালেকা জয়নাবের। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার শক্তি হারিয়েছেন ২০১১ সালে। স্ট্রোকে ডান পাশ অবস হওয়ার পাশাপাশি হারিয়ে ফেলেছেন কথা বলার শক্তিও। তাই চোখ দিয়েই যেন কথা বলার চেষ্টা করলেন। বোঝাতে চাইলেন ক্রিকেটার ছেলে কতোটা সুখে রেখেছে তাকে, তাদেরকে।

অথচ এই মা-ই একটা সময় মুমিনুলের ব্যাট পুড়িয়ে দিতেন। চুরি করে ক্রিকেট খেলতে হতো মুমিনুল হককে। আড়ালে আড়ালে এক প্রকার যুদ্ধই করতে হতো জাতীয় দলের বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানকে। সেই মুমিনুলই এখন তাদের গর্বের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। বাবা নাজমুল হক অবশ্য এতোটা কঠোর ছিলেন না মুমিনুলকে ক্রিকেট না খেলতে দেয়ার ব্যাপারে। মুমিনুলের ছেলেবেলা, বিকেএসপিতে যাওয়া, মাকে ভালোবাসার গল্প- এসব কিছু নিয়ে এর সাথে কথা বললেন মুমিনুলের বাবা নাজমুল হক। সে সব গল্প শুনুন মুমিনুলের বাবার মুখ থেকেই-

বিকেএসপিতে যাওয়ার গল্প: মুমিনুল তখন অনেক ছোট। মুমিনুলকে বিকেএসপিতে দিয়েছি তো ২০০৪ সালে। আমি একটা সরকারি চাকরি করতাম। ৪৫-৫০ বছর চাকরির পেছনেই দিছি। ক্রিকেটের প্রতি কোনো আগ্রহই ছিলো না আমাদের। আমরা কতো ব্যাট ট্যাড পুড়িয়ে দিয়েছি। ওর মা বলতো লেখাপড়া না করে তুমি ক্রিকেট খেলে বেড়াচ্ছো? ও চুরি করে ক্রিকেট খেলতো।

মিরপুরের অনুশীলনে মুমিুনল।

ক্লাস সিক্স-সেভেন থেকেই ও ক্রিকেট খেলে। ফরহাদ নামে একটা ছেলে আছে এখানে। আমাদের ও বলতো মুমিনুল খুব ভালো করছে। আর তখন বিকেএসপি থেকে কোচ আসতো ক্রিকেটার বাছাই করার জন্য। আমরা তো এসব জানি না। ওই ফরহাদ ছেলেটাই মুমিনুলকে নিয়ে যায়। চুরি করে ওকে নিযে গিয়েছিলো স্টেডিয়ামে। আমরা এর কিছুই জানি না। পড়া লেখা না করে এসব ক্রিকেট ট্রিকেট কিসের? তখন মুমিনুল ক্লাস সেভেনে পড়ে। তো ওর খেলা দেখে বিকেএসপির কোচ নাজিম উদ্দিনের পছন্দ হয়ে যায়। সে বলে তুমি তোমার মা বাবাকে নিয়ে আসো। ও বলছে মা বাবা তো রাজী হবে না। তখন আমি একটু এগ্রেসিভ ছিলাম। বলেছি, না এসব ক্রিকেট ক্রিকেট হবে না লেখাপড়া না করে। ক্রিকেটের তখন এমন গুরুত্ব ছিলো না। ২০০৩ সালের কথা বলছি আমি। আমার বড় ছেলেও ক্রিকেট খেলে। ছোট ছেলেও ক্রিকেট খেলে। বড় ছেলে ভালো করে নাই। ওর নাম মারুফুল হক। ও এখন ব্যাংকার। যাই হোক আমরা তো ওর খেলা দেখিনি। কিন্তু কোচরা যখন বলছিলো তো গেলাম ওর মামাদের কাছে।

নাজিম উদ্দিন বলেছিলেন ও ভালো খেলে, ব্যাট ধরতে পারলেই চলে। তখন নভেম্বর মাস। ডিসেম্বরে ভর্তি শুরু। আমরা পত্রিকা দেখে জানুয়ারিতে গেলাম। তো মুমিনুল তো একটু খাটো। মেডিকেলে গেলাম। আগে মেডিকেল হয় ওখানে। সব ছেলে বের হয়ে আসছিলো। শুধু মুমিনুল নেই। বলছিলাম ও আসছে না কেন? তো দেখা গেল আন্ডার হাইট (কম উচ্চতা)। রিজেক্ট হয়ে গেলাম। নাজিম কোচকে বললাম এই অবস্থা। তো উনি বললেন আগামী বছর ট্রাই করেন আর ওকে একটা সাইকেল কিনে দেন। আমি চলে আসলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি।

এক বছর সাইকেল চালিয়েছে এরপর হয়ে গেছে। ২০০৪ এ ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি হয়ে যায়। কিন্তু আগের বছর ছিলো ৪ ফুট ৩ ইঞ্চি। এক ইঞ্চি কম ছিলো। ঢাকা থেকে ফেরার পথে চট্টগ্রাম থেকে একটা সাইকেল কিনে আনলাম ২২০০ টাকা দিয়ে। সাইকেল চালিয়ে ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি হয়ে গেছে। ২ ইঞ্চি বেড়ে গেছে। তো আবার ট্রাই করলাম ২০০৪ সালে। তখন হয়ে গেছে। ইনডোরে নিয়ে গেছে ওকে। ওখান থেকে বের হয়ে আসার সময় চেহারা একটু পরিস্কার দেখলাম। এসে বললো আব্বা চিন্তা করবেন না। ওখান থেকে বললো আপনার ছেলেকে এক মাস ক্যাম্প করতে হবে। ক্যাম্প হবে, তখন আরেক চিন্তা। এখানে ভালো করলে ফাইনাল হবে। ৫০ জন থেকে নেয়া হবে ২৩ জন। প্রথমবার ওর মা গিয়েছিলো। দ্বিতীয়বার আমি একাই নিয়ে যাই মুমিনুলকে। ওর মা বলছে টিকবে না। গিয়ে লাভ নেই।

কিন্তু আমি গিয়েছি। আমি হাল ছাড়িনি। এক মাস ট্রেনিং দিতে হবে তো লাগেজ নিয়ে দিয়ে আসলাম। কোচও বলেছিলো আপনি চিন্তা করবেন না। ও অনেক বড় ক্রিকেটার হবে। এখনো নাজিমকে আমরা ভুলিনি। তার কন্ট্রিবিউশন বেশি। আর হচ্ছে ফরহাদ। ফরহাদ স্টেডিয়ামে না নিয়ে গেলে মুমিনুল আজ আসতো না। এক মাস ট্রেনিং করেছে। তো এখন আরেক টেনশন। নিবে ২৩ জন, আছে ৫০ জন। তখন মোবাইল ছিলো না। ওর মা শিক্ষক ছিলো। ঠিকানা দিযেছি ওর মার স্কুলের। ওর মা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করতো। চিঠি এসেছে যে আপনার ছেলে টিকে গেছে। তারা একটা লিস্ট পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্রিকেটের সরঞ্জাম ৩০ হাজার আর স্কুলের সরঞ্জাম ৩০ হাজার আর ভর্তি ১০ হাজার টাকা। মোট ৭০ হাজার টাকা। ওখানে আমার এক ভাগ্নি জামাই ছিলো তার ওখানে চলে গেলাম। আর পরীক্ষায় ও এক নম্বরে টিকে গেছে। এরপর বিকেএসপি থেকে আরম্ভ। বিকেএসপি থেকে অনূর্ধ্ব-১৯। বিকেএসপি থেকে প্রথম গেছে ভারতে। এরপর গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আর ২০১৩ সালে জাতীয় দলে চলে এসেছে।

 

মুমিনুলের ট্রফি-শোকেসের একটা অংশ।

মায়ের অসুস্থতা: ২০১১ সালে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ছিলো। যেদিন (১০ নভেম্বর ২০১১) ওর মা স্ট্রোক করে সেদিন ও রান করেছে দেড়’শ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলতে গিয়েছিলো ও। ওর মায়ের খবরটা দেয়া হয়নি। যেদিন ও ১৫০ করে ওইদিন রাতে ওর মা স্ট্রোক করে। মুমিনুল বলছিলো মা কোথায়? আমরা বলছিলাম ওয়াশরুমে আছে, নামাজ পড়ছে। এরপর ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি। অ্যাপোলোর আইসিইউতে ছিলো দেড় মাস। আমরা তো হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ পর মুমিনুলকে জানিয়ে দিয়েছি। আরেক সপ্তাহ পর দেশে চলে এসেছে। ওর মাকে দেখে কান্না কাটি করছিলো। অ্যাপোলোতে ছিলো দুই মাস। অনেক টাকা বিল এসেছিলো। সব টাকা মুমিনুল দিয়েছে। এসে প্রথম বিপিএল খেলেছে। ৮ লাখ টাকা পেয়েছিলো। এর পুরোটাই ও দিয়ে দিয়েছে। কিছু টাকা বাকি ছিলো। ওখান থেকে আল্লাহর রহমতে এতোদূরে আসছে আরকি।

মুমিনুলকে নিয়ে বাবার প্রত্যাশা: প্রিমিয়ার লিগে ও তো ভালো করেছে। ৬৭১ রান। এখন কোচ নিলে নেবে। নাহলে তো আর কিছু করার নেই। তবে ও টেস্টে খুব ভালো করে। ওয়ানডেতেও খেলবে আশা করি। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তাহাজ্জতের নামাজ পড়ি। আমার ছেলে যেন ভালো করে। যেন ভালো রান করতে পারে। সব বাবা মাই এমন দোয়া করে। আমার ছেলে কখনোই হতাশ হয় না। ও অনেক পরিশ্রম করতে পারে। আশা করি ও অনেক ভালো করবে।

ব্যাট পুড়িয়ে দেয়া: আমি অতোটা কঠোর ছিলাম না। ওর মা একটু বেশি ছিলো। আমি পুড়াতাম না। ওর মা পুড়িয়ে দিতো। এ জন্য ও ব্যাট বাড়িতে আনতো না। পড়াশোনা না করে খেলার কারণে ওর মা এমন করতো। পরে ওর মাও ধীরে ধীরে এটা মেনে নিয়েছে। দেখেছে বি্কেএসপিতে সুযোগ পেলো। বিকেএসপি থেকে চিঠি আসতো আপনার ছেলে ভালো করছে।

বাড়িতে গেলে মায়ের হাতের প্রিয় খাবার: ও তো মাংশ খুব কম খায়। শাক সবজি বেশি খায়। ভাতও কম খায়। ওর মা তো এখন কিছু করতে পারে না। ওর ভাবি করে সবকিছু। ওর মা তো অসুস্থ।

বাবা গল্প শোনাচ্ছেন, মুমিনুলের মা’ও যেন ফিরে গেলেন মুমিনুলের সেই শৈশবে।

বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটানো: আমরা ঢাকা যাই। কিছুদিন আগেই ঢাকা থেকে এলাম। ওর মা তো গিয়ে অনেকদিন ধরে থাকে। মুমিনুল খুব কম বের হয়। মসজিদে যাই। নামাজ পড়ে চলে আসি। আমাদের সাথেই বেশি সময় কাটায়। আমার নাতি আছে ওকে নিয়ে থাকে।

বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক: অনেক গভীর সম্পর্ক আমাদের। আমাদের কিছু হলে ওর মাথা ঠিক থাকে না। এতো ভক্ত যে বলে বুঝাতে পারবো না। আমার দুটি ছেলেই এমন।

মাকে ভালোবাসার গল্প: মায়ের জন্য অসম্ভব পাগল ও। মুমিনুল বাড়ি আসলে ওর মার সাথেই বেশি সময় থাকে। মার সাথে থাকবে বলে বাইরে বের হয় না একদমই। ওর মাকে নিয়েই থাকে সব সময়। মাকে ওষুধ খাওয়ানো, ভাত খাওয়ানো ও করে। মাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। মাকে মাথায় করে রাখে।

চট্টগ্রামে সিরিজ হলে: চট্টগ্রামে সিরিজ হলে সময় পেলে আমাদের সাথে দেখা করতে চলে আসে। তবে খুব কম আসে। ঈদে আসে। এবার ৮ তারিখে আসবে।

মুমিনুলকে নিয়ে বাবা-মায়ের গর্ব: আমি বাবা হিসেবে অনেক গর্বিত। এমন একটা ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আগে সবাই চিন্তা করতো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাবে আর এখন সবাই চিন্তা করে ক্রিকেটার বানাবে। আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। তার কাছে হাজার শুকরিয়া। খেলার আগে ওর সাথে কথা বলি। তবে ও বলে আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। এখন আমাকে সবাই মুমিনুলের বাবা বলেই চেনে। একবার গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি। লাইসেন্স ছিলো না। পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। থানায় বলেছি আমি মুমিনুলের বাবা। পরে বলেছে কোনো সমস্যা নেই আংকেল। এটাই বেশি ভালো লাগে।

মুমিনুলকে নিয়ে বাবা-মায়ের চিন্তা: আমি আগে পান খেতাম না। এখন মুমিনুলের খেলা দেখি। টেনশনে পান খাওয়া শিখে গেছি। এখন নিয়মিত খেলা দেখি। ও জাতীয় দলে আসার পর থেকে ক্রিকেট খেলা দেখা শুরু করেছি। আর তখন থেকেই পান খাওয়া শুরু। ওর মা ক্রিকেট সব বোঝে। চার ছয় সব বোঝে। চার মারলে ওর মা বলে চার চার চার..। ৯৯ রানে থাকলে আমি দেখি না। বাইরে চলে যাই। ওর মা দেখে। পরে সেঞ্চুরি দেখলে খুব খুশি হই। ১৮১ রানের ইনিংসটা দেখে খুব ভালো লেগেছিলো।

বাবা-মাকে নিয়ে মুমিনুলের স্বপ্ন: এখন চিন্তা ভাবনা হলো আমাদেরকে হজে পাঠাবে। আমাকে বলে মাকে নিয়ে হজ করে আসেন। আমার ছেলে সাদা সিধে। বেশি কথা বলে না। যা কথা বলবে আমাদের সাথেই।

মাঠে গিয়ে মুমিনুলের খেলা দেখা: না কখনো মাঠে গিয়ে ওর খেলা দেখিনি। ওর মাও যায়নি। ও ভাই ভাবিও যায়নি।

সংগৃহীত



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / গোলাম সারোয়ার

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা