mili-sultana

একই সিটিতে থাকি এবং লেখালেখির সুত্র ধরে মহিলাকে আমি চিনি। ফেসবুকীয় সম্পর্ক আমাদের সবার সামাজিক জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। মহিলার দুইছেলে। অবাক হওয়ার অন্ত রইলনা যখন দেখলাম তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের ফেসবুক একাউন্ট রয়েছে। আমেরিকায় এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি তাদের। সুশিক্ষিতা মা (!!) ছেলের ভারচুয়াল প্রতিভায় গদগদ। এমন শিক্ষা ও মানসিকতার প্রতি প্রশ্নবোধক শব্দটি রয়েই যায়। এটা খুব সত্যি যে বিদেশে এসে আমাদের দেশের বাচ্চাগুলো বখে যায় দ্রুত সময়ের মধ্যে। ভিকারুন্নেসা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের মেধাবী ছাত্রী (সামাজিক কারণে তার নাম প্রকাশ করছিনা) মেয়েটি আমেরিকায় পা দিয়ে অন্ধকারের হারিয়ে গেল। বাবা ছিল সচিব। আমেরিকায় এসে উঠতি বয়সী মেয়েটি বছরের মধ্যে খারাপ দিকটা রপ্ত করে ফেলে। মদের বারে কাজ নেয়।নেশা করতে আসা বিভিন্ন লোকের সাথে অবাধ মেলামেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মা বাবার সামনে বাসায় বয়ফ্রেন্ড নিয়ে আপত্তিকর চলাফেরা শুরু করে। মা বাবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল মেয়েটি। এভাবে অনেক ছেলেমেয়ে পাশ্চাত্যরীতি অনুসরণ করছে। 

বর্তমান সময়ে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বাচ্চাদের বিরত রাখা খুব দুরূহ ব্যাপার। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোমলমতী বাচ্চারা শিক্ষণীয় বিষয়ের সাথে যুক্ত হচ্ছে। তবে কিছু কিছু বাচ্চা অভিভাবকদের ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে ইন্টারনেটের ডার্কনেসের সাথে মিশে যাচ্ছে। এই কারণে অনেক গার্ডিয়ান বাচ্চাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিয়ে নজরদারি করেন। এখানে তাদের দোষ নেই। অনেক অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চা ফেসবুক একাউন্ট খুলে বসে আছে। খুউব দুঃখের কথা যে সেসব বাচ্চাদের মা বাবা এই নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এসব দেখে একজন মা হিসেবে আমিও উদ্বিগ্ন হই। আমিও চেষ্টা করি আমার সন্তানরা তাদের মায়ের সাথে ভালমন্দ সব শেয়ার করুক। যেকোনো বিষয় নিয়ে মায়ের সাথে তাদের খোলামেলা আলোচনা হোক। তারা যেন লুকোচুরি খেলবার ভাবনাকে প্রশ্রয় না দেয়। সচেতন এবং আধুনিক অভিভাবকদের এই ভাবনা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার, কিন্তু দিনে কতবার ছেলে বা মেয়ের ঘরে উঁকি মেরে দেখবেন? আর, যারা চাকরি বা ব্যবসা করছেন – তাঁদের ক্ষেত্রে তো তাহলে সব ছেড়ে বাসায় বসে থাকা কোনো উপায় নেই ! বাচ্চারাও এখন আর পিছিয়ে নেই। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েরাই লুকোচুরি করে তাদের অনলাইন অ্যাক্টিভিটিজ নিয়ে। তারাও জানে অনলাইনে যা দেখছে বা করছে তাদের বাবা মা ভালোভাবে নেবেন না। তাইতো প্রাইভেসী সেটিংসসে গিয়ে তারা খুব চালাকি করে। অভিভাবক এবং আত্মীয় পরিজনদেরকে রেসট্রিকশানে বেঁধে দেয়। আত্মীয় পরিজনরা হয়ে যায় কালো তালিকাভুক্ত। অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে ৭০% বাবা-মাই জানেন না যে সন্তান তাঁদের অগোচরে অনলাইনে ভায়োলেন্ট ও পর্ন জাতীয় বিষয়াদি দেখে থাকেন। এখানেই শেষ নয়, ভয়ংকর হলেও সত্যি যে আর এসবের জেরেই সেসব বাচ্চাদের অনেকেই সাইবার বুলিং, ইমেইল হ্যাকিংসহ অপরিচিতদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। 

আমার সিক্সথ গ্রেড পড়ুয়া ছোট মেয়েটি প্রতিদিন স্কুল থেকে দুই তিনটে উল্লেখযোগ্য ঘটনার ডালি সাজিয়ে বাসায় ফেরে। তার কচি কোমল অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করে মায়ের সাথে। ইদানীং আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেছি ওর শেয়ারিং, অভিজ্ঞতার প্রতি। স্কুল চলাকালীন যেকোন নেগেটিভ পজিটিভ ঘটনা সে তার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ এবং মুল্যায়ন করে। সব ঘটনা শোনার পর আমি তার অভিমত জানতে চাই। এই পরামর্শ আমি ওর থার্ড গ্রেডের টিচার মিসেস ক্যাপলানের কাছ থেকে পেয়েছি। আজ বুঝতে পারছি মিসেস ক্যাপলানের পরামর্শটি অসাধারণ। মেয়ের মুখে শুনলাম তার ক্লাসের এক ছেলের বাবা মাকে স্কুল কতৃপক্ষ নোটিশ দিয়েছে। বিগত তিন বছর ধরে ফেসবুকে একাউন্ট খুলে আছে। শুধু তাই নয়, ছেলেটি ফেসবুকে ফেইক নাম ছবি ইউজ করেছে।আমি ছেলেটির বয়স হিসাব করে দেখলাম তিন বছর আগে তার বয়স ছিল ৯ বছর। এত উদাসীন বাবা মা কি করে হন তা আমার বোধগম্য নয়।ক্লাসে বখাটের মত বিহেভ করার কারণে টিচার প্রিন্সিপালকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। প্রিন্সিপ্যাল ছেলেটির বাবা মাকে জরুরী তলব করেছেন। ওই ছেলে “F – Word” চর্চা করে শোনার পর তাজ্জব হয়ে গেলাম। তার বাবা মা দুজনেই চাকরী করেন। টাকার পেছনে এতই দৌড়ান তারা যে নিউইয়র্ক শহরে তাদের দুটো বাড়ির মালিক হয়েছেন। দেশে ফ্ল্যাট কিনেছেন। আর্থিক সচ্ছলতায় হাবুডুবু করছেন। ছেলেটির বাবা মা সন্তানকে বেবী সিটারের কাছে সঁপে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আদৌ কি উপলব্ধি করতে পারছেন তাদের এসব বড়লোকি চালচলন একেবারে অর্থহীন? সন্তানকে মানুষের মত মানুষ না করতে পারার ব্যর্থতার দায় কি তারা এড়াতে পারবেন? স্কুল কতৃপক্ষ গার্ডিয়ানকে স্কুলে ডেকে নোটিশ দেয়ার মত লজ্জাজনক ব্যাপার আর কি হতে পারে? কি মুল্য আছে এমন গাড়ি বাড়ির? যেখানে শিক্ষণীয় পারিবারিক কোন সংস্কারই নাই !

আরেক সদ্য ধনবান দম্পতিকে দেখলাম তাদের বাচ্চা ট্যাবলেট কিনে দেয়ার জন্য বায়না ধরার গল্প বলে নিজেদেরকে গৌরবান্বিত পিতা মাতা হিসেবে জাহির করার ব্যর্থ প্রয়াস করছেন। ফিফথ গ্রেডের ছেলে আইফোন ইউজ করে এসব ভয়ংকর কর্মগুলো কেবল অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী টাইপের লোকেরা করে।

হঠাৎ করে টাকা পয়সার মালিক বনে যাওয়া মানুষগুলো বুঝতে পারেনা,ট্যাবলেট আইফোন চালানোর মধ্যে বাহাদুরি নেই। প্রকৃত স্মার্টনেস মেধাবী স্টুডেন্ট হওয়ার মধ্যেই নিহিত। সদ্য ধনী বাবা মায়েরা যদি সঠিক সময়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমান তবে ভবিষ্যতের বিপদ থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। চোখ বন্ধ রাখলে প্রলয় ঠেকানো যায়না — এই কথা মনে রাখতে হবে।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / আ/ম

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা