bangla6156.jpg

ক্ষমতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিপ্রায়ে যে রাজনীতি — মানুষের সম্মিলিত প্রত্যাশা ও দাবির কাছে তা এক ফুত্কারে উড়ে যায়। এই দাবি যে কখন দানা বেঁধে ওঠে তা ঝানু রাজনীতিবিদদের হিসেব-নিকেষেও অনেক সময় ধরা পড়ে না। যেমনটি ধরা পড়েনি একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সময়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত যখন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গ্রহণ করলো তখনই প্রমাণিত হলো যে, তারা রাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন। সে কারণে মানুষের ইচ্ছা ও তাদের দাবির প্রতি নেতৃবৃন্দের চিন্তা কম ছিল। সে কারণেই সর্বদলীয় এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেয়নি ছাত্ররা। তারা আগে থেকেই মনে মনে প্রস্তুত ছিল ১৪৪ ধারা অমান্য করে তাদের দাবির তীব্রতা প্রকাশের জন্য।

এই ১৪৪ ধারার ভাঙার সিদ্ধান্ত তখন গ্রহণ করেছিল তিনটি পক্ষ:সাধারণ ছাত্র ও কর্মীরা এবং ছাত্র নেতাদের কয়েকজন, পৃথকভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এসে। পরদিন অর্থাত্ ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভায় এর যে প্রতিফলন ঘটেছিল তা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসেই শুধু নয় বাঙালি জাতির পরবর্তীকাল ও বর্তমানেও বাংলাদেশের যে কোন আন্দোলন সংগ্রামের জন্য প্রেরণাদায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের যে প্রস্তুতি ছাত্ররা ৪ঠা ফেব্রুয়ারির পর থেকে চালাচ্ছিলেন, যে কর্মসূচী তারা গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল নিয়মতান্ত্রিক। বরঞ্চ মুসলিম আওয়ামী লীগ ও গুপ্ত কমিউনিস্ট পার্টি চেষ্টা করেছিল এই আন্দোলনের রাশ নিয়ন্ত্রণ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করতে। কিন্তু তাদের চিন্তায় ভুল ছিল। তারা অনুধাবন করতে পারেননি মানুষ বিস্ফোরণের জন্য কী রকম উন্মুখ হয়ে আছে।

২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে ফজলুল হক হল আর ঢাকা হলের (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) মাঝখানের পুকুরপাড়ে রচিত হয়েছিল আরেক ইতিহাস। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যে কোন মূল্যেই হোক, ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। এবং তার জন্য কতগুলো কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল। যেহেতু আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে ফেব্রুয়ারির ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করলে তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে মত দিতে পারেন এবং তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে, তাই গাজীউল হককেই উক্ত আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করতে হবে। তিনি যদি সভার আগেই গ্রেপ্তার হয়ে যান এম আর আখতার মুকুল সভাপতিত্ব করবেন, তিনি গ্রেফতার হলে কমরুদ্দিন শহুদ সভাপতিত্ব করবেন। সেদিনের সেই ঘটনা বিশদভাবে উঠে এসেছে বশীর আলহেলালের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে। সেখানে পুকুরপাড়ের সেই বৈঠকের বর্ণনা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান করেছেন এভাবে, ‘২০ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যাটা আমার কাছে খুব থমথমে মনে হয়েছিল। কি রকম একটা বিপদসংকেতের মত শোনাচ্ছিল সরকারি গাড়ি থেকে ১৪৪ ধারা জারির সংবাদ-পরিবেশনটি। যখন শুনলাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হই।... রাত ন’টা দশটার সময় আমরা সাত-আটজন বন্ধু মিলিত হই ফজলুল হক হলের পুকুরের পূর্ব পাড়ে। যতদূর মনে পড়ে সেখানে মুহম্মদ সুলতান, আবদুল মমিন, জিল্লুর রহমান, কামরুদ্দিন শহুদ, গাজীউল হক, আনোয়ারুল হক খান ও এম আর আখতার উপস্থিত ছিলেন। অনেক পরে শুনেছি যে, ঐ বৈঠকে একজন গুপ্তচরও উপস্থিত ছিলেন। আমি এখন তাঁর চেহারা মনে করতে পারছি না।’

গাজীউল হক বলেছেন, এ বৈঠকে ১১জন উপস্থিত ছিলেন। তিনি এছাড়া অন্য যেসব নাম বলেছেন সেগুলো হলো :এস এ বারী এটি, মশিয়ুর রহমান, আনোয়ার হোসেন। তিনিও একজনের নাম মনে করতে পারেননি। আর তিনি জানিয়েছেন এ বৈঠক রাত প্রায় বারটার দিকে হয়েছিল। এম আর আখতার মুকুল অসতর্কভাবে দুটি নাম বলেছেন :আহমদ রফিক ও অলি আহাদ। তবে অলি আহাদ জানিয়েছেন তিনি সেখানে ছিলেন না। মোহাম্মদ সুলতানও ১১ জনের কথা বলেছেন এবং অন্যের তালিকায় নেই এমন একটা নাম বলেছেন তিনি কেজি মোস্তফা।

১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না— সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সভাশেষে বেরিয়ে আসেন অলি আহাদ। এসময় জগন্নাথ কলেজের ছাত্র নেয়ামাল বাসির ও তার সঙ্গীদের সাথে দেখা হয়। অলি আহাদ তাদের সুশৃংখলভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা ঢাকা বিশ্বদ্যািলয় কলাভবন প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেদিন গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্র কর্মী ৪৩/১ যোগীনগরে অলি আহাদের সঙ্গে দেখা করেন। ঢাকার নানা এলাকার কর্মীরাও এসেছিলেন নির্দেশ জানতে। তত্কালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে ছাত্রদের অভিমানে ভয়ানক আঘাত করেছিল। সেই অপমানের জ্বালা বুকে নিয়ে বসন্তের বাতাস ও সূর্য যে পলাশ রঙ ছড়িয়ে প্রভাতে দেখা দেয় সেই সূর্যসম তেজ নিয়ে সবাই পথে নেমেছিল ভাষার দাবিতে। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এই বসন্ত ঋতুর এক মহাযোগ রয়েছে। বসন্ত এলেই মানুষের মনে বিদ্রোহের আলো জ্বলে উঠেছে বার বার। ১৯৪৮ মার্চের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫২ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মার্চ— সেই স্বাক্ষীই দেয়।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / আ/ম

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা