Islam

মদিনার নীরব রাস্তা ধরে বিশ্বনবী হাঁটছেন, সঙ্গে আছেন প্রিয় কিশোর খাদেম আনাস (রা.)। প্রিয় নবীর গায়ে সুন্দর একটি দামি চাদর।

বিদেশ থেকে আনা কোনো এক প্রিয় হয়তো রাসুলকে হাদিয়া দিয়েছেন। আনমনে চলছেন রাসুল (সা.)। চলার পথে সামনে দাঁড়াল এক গ্রাম্য লোক। কোনো কথা-বার্তা ছাড়াই রাসুলের গায়ে জড়ানো চাদর ধরে আচমকা টান মারতে থাকলেন লোকটি। সজোরে হেঁচকা টানের কারণে রাসুল (সা.)-এর দেহ মোবারকে রক্তাভ দাগ পড়ে গেল। নবীজি ব্যথা পেলেন। ধৈর্যের সঙ্গে লোকটিকে দেখছেন শুধু। কিছু বলছেন না। এবার লোকটি বলল, হে মুহাম্মাদ! ‘তোমার কাছে আল্লাহ প্রদত্ত অনেক সম্পদ আছে, সেসব  থেকে আমাকে কিছু দাও। ’ যেন তাঁর কাছ থেকে কোনো ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা আদায় করার জন্য রুক্ষ ব্যবহার করছে। দয়ার নবী (সা.) মহানুভবতার সঙ্গে স্মিত হাসি দিয়ে অবোধ লোকটিকে কিছু দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। লোকটি তার চাহিদা পূরণ করে চলে গেল। নবী (সা.) শুধু দেখলেন আর দোয়া করলেন। শুধু কল্যাণ চাইলেন, প্রতিশোধ নিলেন না। এ ক্ষমার নজির মিলবে কি কখনো? (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪১৪৯) আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ।

 মরুভূমিতে লু হাওয়া বইছে। রৌদ্রের তাপ নয়, যেন আগুনের ফুলকি পড়ছে ওপর থেকে। নবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে সফরের বিরতি ঘোষণা করলেন। ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বৃক্ষ আর ছায়াদার গাছের নিচে সাহাবারা আশ্রয় নিলেন। ক্লান্ত-শ্রান্ত সাহাবারা ঘুমিয়েও গেছেন। নবী (সা.) একটু দূরে এক গাছের ছায়ায় বিশ্রামের জায়গা নির্ধারণ করলেন। সঙ্গে থাকা তরবারি গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে নিদ্রায় গা এলিয়ে দিলেন। হঠাৎ এক আরব বেদুইন গ্রাম্য ব্যক্তি এখানে এলো। ঝুলন্ত তরবারি দেখে তার মাথায় খুন চেপে বসল, নৃশংস হত্যার ইচ্ছায় উন্মত্ত হয়ে গেল। রাসুলের ঝুলানো তরবারি হাতে নিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, ‘এবার তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে, মুহাম্মাদ?’

রাসুল (সা.) চোখ মেলে তাকালেন। দেখলেন অনতি দূরে এক বেদুইন হত্যার নেশায় হাতে খোলা তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেদুইন আবার উদ্ধত কণ্ঠে বলল, ‘আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে?’ বিস্ময়কর দৃঢ় ও স্থির এবং গম্ভীর কণ্ঠে মহানবী (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ! আমার আল্লাহই আমাকে তোমার হাত থেকে বাঁচাবে। ’ এভাবে সে প্রশ্ন করে যেতে লাগল, আর তার জবাবও রাসুল (সা.) এভাবেই দিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃতীয়বার যখন রাসুল (সা.) গম্ভীরভাবে জবাব দিলেন যে আমাকে আমার আল্লাহই বাঁচাবেন, তখন মরুভূমিতে যেন এক শব্দের অনুরণন হতে লাগল। বেদুইন কাঁপতে লাগল। পড়ে গেল হাতের তরবারি। এবার সে নিরস্ত্র হয়ে গেল। রাসুল (সা.) তরবারিটি উঠিয়ে নিলেন। তার ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ রাসুল ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, এবার তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? সাহাবিদের ডাকলেন। ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে সাহাবিরা বিস্মিত হয়ে গেলেন, কেউ কেউ হয়তো হত্যা করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিশ্বনবী (সা.) বেদুইনকে ক্ষমা করে দিলেন। তৃষিত মরুভূমিতে ঝরে পড়ল দয়া ও ভালোবাসার মুক্তোর দানা। ইতিহাস হয়ে রইল ক্ষমার প্রান্তর। আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ।

দুই দিন হলো নবী (সা.) কাউকে সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না। প্রিয় সাহাবি ওমর (রা.) পেরেশান। তৃতীয়বারে অনুমতি মিলল। রাসুলের বাসগৃহে সন্তর্পণে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও নেই বিশ্বনবীর ঘরে। ঘরের এক কোণে সামান্য যব। খুঁটিতে ঝুলছে একটি পশুর চামড়া। দুনিয়া ও আখেরাতের বাদশাহর ঘর দেখতে দেখতে ওমর (রা.)-এর বোধগুলো ঝাপসা হয়ে গেল। প্রিয় নবী সে ঘরে একটি দড়ির খাটে শুয়ে আছেন, চাঁদের জমিনের মতো পিঠে দড়ির স্পষ্ট দাগগুলো লাল হয়ে আছে। কোমল ত্বকে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর আঘাত আঁচড়ের মতোই জ্বলজ্বল করছে। ওমর (রা.) ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কষ্টের ভাবগুলো অশ্রু হয়ে দুচোখ বেয়ে নহরের মতো বয়ে চলতে লাগল। সীমাহীন ভালোবাসার এক ভুবনে বন্দি হয়ে গেলেন রাসুলপ্রেমিক ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। কোমল কণ্ঠে নবী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন—ওমর, তুমি কাঁদছ কেন? ওমর (রা.) বললেন, রোম ও পারস্য সম্রাট কাফির হয়েও দুনিয়ার প্রাচুর্য ভোগ করছে, অথচ আপনি নবী হয়ে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত। মানবতার নবী ভালোবাসার আবেশে বললেন, ওমর! তুমি কি চাও না যে আমি ক্ষয়-লয়হীন প্রাচুর্যময় অনাবিল সুখের জান্নাত লাভ করি? অশ্রুসিক্ত ওমরের দুচোখ রাসুলের প্রশান্ত মুখের ওপর স্থির হয়ে গেল। অনুভব করলেন, বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের পালকগুলো উড়ে চলে যাচ্ছে দূরে, বহুদূরে। আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মদ।

‘যদি বলি, পেছন থেকে তোমাদের বিপদ আসছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?’ কোরাইশদের উদ্দেশে এ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন বিশ্বনবী। কোরাইশরা বলল—হ্যাঁ, বিশ্বাস করব, প্রিয় নবী বললেন, তোমরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ না বললে তার চেয়েও বেশি বিপদ ধেয়ে আসবে! এটা শুনে দয়ার নবীকে প্রহার করতে গেল আবু লাহাব। আল্লাহ তাআলা এ ন্যক্কারজনক কাজের প্রতিবাদে সুরা লাহাব নাজিল করেন। প্রিয় নবীকে সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু একসময় এ কাফিরদের ষড়যন্ত্র আর নির্যাতনে বাধ্য হয়ে নবী মুহাম্মাদ (সা.) জন্মভূমি ছাড়লেন।

সময়ের ব্যবধান। আট বছর পর এই মক্কা বিজয় হলো। নবীর পদদলে আরব গোত্রপতি। তিনি এখন এ ভূমির প্রেসিডেন্ট, বিচারক, যুদ্ধজয়ী সেনানায়ক। শত্রুরা জানের ভয়ে পলায়নপর। আরাফা এলাকা থেকে ধরে আনা হলো সেই আবু লাহাবের ফেরারি দুই পুত্রকে। জীবনের রক্তাক্ত মীমাংসা আর শাস্তির পরিণতিতে ভীতু ও কম্পবান খলনায়কের সন্তানরা। আজন্ম অপরাধবোধ শেষে আজ যেন তার প্রায়শ্চিত্ত দিতে কল্লা যাবে।

উতবা আর মাতাব দুই ভাই। জনকের নাম নিকৃষ্ট আবু লাহাব। রাসুলের দুই হাতে দুজন। কী হবে পরিণতি, দেখার জন্য বস্ফািরিত নেত্রে তাকিয়ে আছে যুগ যুগ নির্যাতিত সাহাবিরা। দুই ভাইও প্রস্তুত মৃত্যুর জন্য। গম্ভীর কণ্ঠে শান্তির নবী ঘোষণা করলেন—‘আজ তোমাদের ভয় নেই, তোমরা নিরাপদ। ’ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত কাফির সন্তান দুজন মুহূর্তে বদলে গেল। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ঝড় থেকে উঠে এসে শান্তির স্নিগ্ধ সমান্তরালে আশ্রয় নিল। সুরভিত দিগন্তে প্রবেশ করে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন। আল্লাহর রাসুল বায়তুল্লায় দুই ভাইয়ের জন্য দোয়া করলেন। হাসলেন। খুশি হলেন।

তিনিই বিশ্বনবী। যিনি গোটা সৃষ্টির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর আগমনে ভালোবাসা ও উদারতার এক আলোকিত জোয়ারে ভেসে গেছে প্রতিশোধ ও রক্তমূল্যের অন্ধকার হিসাব-নিকাশ। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বে ছুটেছে শান্তির মিছিল, ক্ষমার মিছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক শান্তিময় ধরা। হে প্রিয় রাসুল! তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বায়তুল আতিক কেন্দ্রীয় মসজিদ, বারিধারা, ঢাকা।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা