kobor-1

কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে তার জন্য করণীয়:
 
কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে তার জন্য জীবিতদের কতিপয় করণীয় রয়েছে। সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
 
১) মৃত্যুর সংবাদ শুনে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন” পাঠ করা এবং ধৈর্য ধারণ করা।
২) মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া, কাফন, জানাযা এবং দাফন সম্পন্ন করা।
৩) মৃত ব্যক্তির জন্য দুয়া করা।
৪) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা।
৫) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলী হজ্জ বা উমরা আদায় করা।
৬) মানতের রোযা বাকি থাকা অবস্থায় কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার পক্ষ থেকে তা পালন করা। আর রামাযানের রোযা বাকি থাকলে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একজন মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করা।
৭) সে যদি ঋণ রেখে মারা যায় অথবা কোন সম্পত্তি ওয়াকফ বা ওসীয়ত করে যায় তবে তা প্রাপকের কাছে বুঝিয়ে দেয়া।
৮) মহিলার জন্য স্বামী বা নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে শোক পালন করা।
 
নিম্নে উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পেশ করা হল:
 
১) মৃত্যুর সংবাদ শুনে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন’ পাঠ করা এবং ধৈর্য ধারণ করা:
 মৃত্যু সংবাদ শুনে `ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর তকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন:
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّـهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَـئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ – وَأُولَـئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“যখন তারা বিপদে পতিত হয়,তখন বলে, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” (নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো) তারা সে সমস্ত লোক,যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত। “[2]
 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
« مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللَّهُ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ اللَّهُمَّ أْجُرْنِى فِى مُصِيبَتِى وَأَخْلِفْ لِى خَيْرًا مِنْهَا. إِلاَّ أَخْلَفَ اللَّهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا »
“কোন মুসলিমের বিপদ হলে সে যদি বলে: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন আল্লাহুম্মা আজুরনী ফী মুসীবাতী ওয়া আখলিফলী খাইরান মিনহা” (আমরা আল্লাহরই। আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, আমার বিপদে তুমি আমাকে প্রতিদান দাও। এই বিপদের বিনিময়ে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দাও) তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার বিনিময়ে তাকে আরও উত্তম প্রতিদান দিবেন। “[3]
 
আর কোন ব্যক্তি যদি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য বিরাট পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى لِعَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ إِذَا ذَهَبَ بِصَفِيِّهِ مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ فَصَبَرَ وَاحْتَسَبَ بِثَوَابٍ دُونَ الْجَنَّةِ
“আল্লাহ তায়ালা যখন কোন মুমিন ব্যক্তির কোন প্রিয় মানুষকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যান তখন সে যদি সবর করে এবং আল্লাহর নিকট প্রতিদান আশা করে তবে তিনি তার জন্য জান্নাতের আদেশ ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হন না। ”[4]
 
২) মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া, কাফন, জানাযা এবং দাফন সম্পন্ন করা:
কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে জীবিত মানুষদের উপর আবশ্যক হল, তার গোসল, কাফন, জানাযা এবং দাফন কার্য সম্পন্ন করা। এটি ফরযে কেফায়া। কিছু সংখ্যক মুসলিম এটি সম্পন্ন করলে সকলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। এ বিষয়টি মুসলিমদের পারস্পারিক অধিকারের মধ্যে একটি এবং তা অনেক সওয়াবের কাজ। যেমন আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
 « مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّىَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ » . قِيلَ وَمَا الْقِيرَاطَانِ قَالَ « مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ »
“যে ব্যক্তি জানাযার নামাযে উপস্থিত হবে তার জন্য রয়েছে এক কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব আর যে দাফনেও উপস্থিত হবে তার জন্য দু কিরাত সমপরিমাণ সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, কিরাত কী? তিনি বললেন: দুটি বড় বড় পাহাড় সমপরিমাণ। “[5]
 
 
২) মৃত ব্যক্তির জন্য দুয়া করা:
জীবিত ব্যক্তিগণ মৃত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দুয়া করবে। কারণ, মানুষ মারা যাওয়ার পর তার জন্য সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন দুয়া। তাই তার জন্য আমাদেরকে দুয়া করতে হবে আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে ক্ষমা করে দেন তার গুনাহ-খাতা মোচন করে দেন। যেমন আল্লাহ বলেন:
 وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে,হে আমাদের প্রতিপালক,আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমানের সাথে (দুনিয়া থেকে) চলে গেছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখিও না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো অতি মেহেরবান এবং দয়ালু।”[6]
 
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মৃত্যু বরণ করলে তার আমলের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ব্যতীত: যদি সে সাদকায়ে জারিয়া রেখে যায়,এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করে যায় যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হবে এবং এমন নেককার সন্তান রেখে যায় যে তার জন্য দুয়া করবে।” [7]
 
তবে এ দুয়া করতে হবে একাকী, নীরবে-নিভৃতে। উচ্চ আওয়াজে বা সম্মিলিতভাবে অথবা হাফেজ-কারী সাহেবদেরকে ডেকে দুয়া করিয়ে নেয়া এবং তাদেরকে পয়সা দেয়া ভিত্তিহীন এবং বিদয়াত যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
 
৩) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা:
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা হলে কবরে তার সওয়াব পৌঁছে। চাই মৃতের সন্তান, পিতা-মাতা অথবা অন্য কোন মুসলাম দান করুক না কেন। যদিও কতিপয় আলেমের মত হল, দান-সদকা শুধু সন্তানের পক্ষ থেকে হলে পিতা-মাতা কবরে সওয়াবের অধিকারী হবেন।
عَنْ عَائِشَةَ – رضى الله عنها – أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِىِّ – صلى الله عليه وسلم إِنَّ أُمِّى افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا ، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ ، فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে জিজ্ঞাসা করল যে,আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছে। আমার ধারণা মৃত্যুর আগে কথা বলতে পারলে তিনি দান করতেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করি তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? তিনি বলেন: হ্যাঁ।[8]
 
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম কে বললেন:
أِنَّ أَبِى مَاتَ وَتَرَكَ مَالاً وَلَمْ يُوصِ فَهَلْ يُكَفِّرُ عَنْهُ أَنْ أَتَصَدَّقَ عَنْهُ قَالَ « نَعَمْ»
“আমার আব্বা মৃত্যু বরণ করেছেন। কিন্তু কোন ওসীয়ত করে যান নি। আমি তার পক্ষ থেকে দান করলে তার কি গুনাহ মোচন হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। “[9]
 
এমন জিনিস দান করা উত্তম যা দীর্ঘ দিন এবং স্থায়ীভাবে মানুষের উপকারে আসে: হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَجُلاً قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّى تُوُفِّيَتْ أَفَيَنْفَعُهَا إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا فَقَالَ نَعَمْ قَالَ فَإِنَّ لِى مَخْرَفًا وَإِنِّى أُشْهِدُكَ أَنِّى قَدْ تَصَدَّقْتُ بِهِ عَنْهَا
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত। তিনি বলেন,এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা মারা গেছেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান করি তবে কি তাঁর উপকারে আসবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। তখন লোকটি বলল: আমার একটি ফলের বাগান আছে (খেজুর, আঙ্গুর ইত্যাদি)। আমি আপনাকে স্বাক্ষী রেখে বলছি, ঐ বাগানটি আমি আমার মায়ের পক্ষ থেকে দান করে দিলাম। [10]
 
উপকারী এবং স্থায়ী দান কয়েক প্রকার:
 
১) পানির ব্যবস্থা করা 
২) এতিমের প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করা 
৩) অসহায় মানুষের বাসস্থান তৈরি করা 
৪) গরীব তালিবে ইলমকে সাহায্য-সহযোগিতা করা 
৫) দাতব্য চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল নির্মান 
৬) মসজিদ নির্মান ইত্যাদি।
 
৪) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ ও উমরা সম্পাদন করা:
ক) ফরজ হজ্জ : কোন ব্যক্তি যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যার উপর ফরজ হজ্জ বাকি আছে তাহলে তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে তার পক্ষ থেকে হজ্জ সম্পাদন করা আবশ্যক। তবে যে ব্যক্তি এই বদলী হজ্জ সম্পাদন করবে তার জন্য আগে নিজের হজ্জ সম্পাদন করা অপরিহার্য। চাই সে মৃত্যুর আগে তার পক্ষ থেকে হজ্জ করার জন্য অসীয়ত করুক অথবা না করুক। এর মাধ্যমে সে ব্যক্তি তার ফরজ হজ্জ থেকে অব্যহতি লাভ করবে।
 
খ) নফল হজ্জ ও উমরা: মানুষ যদি মারা যায় তবে তার পক্ষ থেকে যে কোন মুসলিম নফল হজ্জ ও ওমরা সম্পাদন করতে পারে। অর্থাৎ কেউ তার পক্ষ থেকে হজ্জ বা উমরা করলে ইনশাআল্লাহ সে কবরে শায়িত অবস্থায় তার সওয়াব লাভ করবে।
 
গ) মানতের হজ্জ: কোন ব্যক্তি যদি হজ্জের মান্নত করে কিন্তু হজ্জ সম্পাদনের আগেই মারা যায় তবে তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে বদলী হজ্জ সম্পাদন করা আবশ্যক।
 
যেমন সহীহ বুখারীতে প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত,বনী জুহাইনা সম্প্রদায়ের এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, আমার মা হজ্জের মানত করেছিলেন,কিন্তু হজ্জ করার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ পালন করব? তিনি বললেন,“তোমার মায়ের উপর যদি ঋণ থাকত তবে কি তুমি তা আদায় করতে না? আল্লাহর পাওনা আদায় কর। কারণ,আল্লাহ তো তাঁর পাওনা পাওয়ার বেশী হকদার।” [11]
 
উক্ত হাদীসে এ কথা স্পষ্ট যে, কোন ব্যক্তি যদি হজ্জ করার মানত করে কিন্তু হজ্জ করার আগেই মারা যায় তবে তার পক্ষ থেকে তার আত্মীয়গণ বদলী হজ্জ সম্পাদন করলে সে ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট হবে।
 
তবে এখান থেকে বুঝা যায় যে, মানতের হজ্জ যেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ ছিল না বরং সে নিজের জন্য ফরজ করে নিয়েছে সেটা পালন করা আবশ্যক। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হজ্জ ফরজ ছিল আরও সঙ্গতভাবে তা পালন করা আবশ্যক হবে।
 
আর মানতকে ঋণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং ফরজ হজ্জ তো আরও বড় ঋণ যা পালন না করে মারা গেলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না যতক্ষণ না তা আদায় করা হয়।


উত্তরানিউজ২৪ডটকম / আ/ম

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা