ICT

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই মুহূর্তে আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই এক বিশেষ জনকে, সে নিজেও আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভে উদগ্রীব। বিশেষ জনটি আর কেউ নয়, সোফিয়া।

বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান সোশ্যাল রোবট। ’ ঘোষকের এই কথার মধ্যেই মঞ্চে ঢোকে যন্ত্রমানবী সোফিয়া, তুমুল করতালির মধ্যে। এর পরই প্রধানমন্ত্রী বলে ওঠেন : ‘আমরা এখন সোফিয়ার সঙ্গে কথা বলব, হ্যালো সোফিয়া। হাউ আর ইউ (তুমি কেমন আছ, সোফিয়া?)’। জবাবে সোফিয়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার সম্বোধন করে শুরু করে তার কথোপকথন। শুধু তাই নয়, আলাপনের একপর্যায়ে সোফিয়া নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান থেকে কথা বলে। সে প্রধানমন্ত্রীকে ওয়ার্ল্ড ডিজিটাল সম্মেলন-২০১৭-এর উদ্বোধন ডিজিটালি ঘোষণা করার অনুরোধ করে। সোফিয়ার কথামতো প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতেই যেই বলেন, ‘আমি ডিজিটাল স্টাইলেই উদ্বোধন করছি’, সোফিয়া বুঝে যায় বিষয়টি এবং বলে ওঠে ‘শিওর, অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার’। এভাবেই মানুষ ও যন্ত্রমানবীর যৌথ বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয় চার দিনের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড সম্মেলন ২০১৭।

 দুপুরের পর সোফিয়া ‘টেক-টক উইথ সোফিয়া’ সেশনেও সাধারণ দর্শনার্থীদের মুখোমুখি হয়। তবে দর্শকদের অতিরিক্ত ভিড়ে অনুষ্ঠানটি সংক্ষিপ্ত করতে হয়। জামদানি কাপড়ের জামায় রোবট সোফিয়ার বাঙালিয়ানা ভাব থাকলেও দুই সেশনেই তার সঙ্গে সব কথোপকথনই করতে হয়েছে যথারীতি ইংরেজিতে।

উদ্বোধনী সেশনে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন সোফিয়াকে: হাউ ডু ইউ নো মি? জবাবে সোফিয়া বলে, ‘আমি আপনার বিষয়ে পড়েছি। ’ সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, তা সে জানে। শেখ হাসিনাকে যে বিশ্বে এখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলা হচ্ছে, তাঁর উদ্যোগেই যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাও তার জানা। সোফিয়া আরো বলে, প্রধানমন্ত্রীর নাতনির নাম যে তার মতোই সোফিয়া, তাও তার অজানা নয়। এ কথায় বিস্মিত হন খোদ প্রধানমন্ত্রী। তিনি সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানের অতিথিদের জানালেন, তাঁর ছেলে ও তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের মেয়ের নামও সোফিয়া।

এরপর সোফিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তুমি তো আমার এবং আমার ভিশন সম্পর্কে অনেক কিছু জানো। ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে তুমি কী জানো?’ সোফিয়া বলে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের পদযাত্রা শুরু করা হয় ২০০৯ সালে। অর্থনীতির সব খাতকে ডিজিটালাইজ করার লক্ষ্য সামনে রেখে। লক্ষ্যের মধ্যে আরো রয়েছে আইসিটি রপ্তানি থেকে পাঁচ বিলিয়ন ইউএস ডলার আয়।

উদ্বোধন শেষ হলে একই স্থানে সোফিয়াকে নিয়ে আড়াইটায় ছিল ‘টেক-টক উইথ সোফিয়া’ সেশন। হলভরা দর্শকের কোলাহলের মধ্যেই তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গাউসুল আলম শাওন সোফিয়ার নির্মাতা ডেভিড হ্যানসনকে পরিচয় করিয়ে দেন। হ্যানসনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পরই যন্ত্রমানবীর কৃত্রিম বুদ্ভিমত্বার সঙ্গে পরিচয় ঘটে দর্শকের। শাওনের অনেকগুলো প্রশ্নের পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলকের প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর দিয়ে দর্শকদের বিস্মিত করে সোফিয়া।

সোফিয়ার সপ্রতিভ সব উত্তর : ‘সোফিয়া, তুমি কি জানো, তুমি এখন কোথায়?’ শাওনের এই প্রশ্নের জবাবে আসে সপ্রতিভ উত্তর : ‘মাই মাইন্ড ইজ ইন দ্য ক্লাউড’ (একটু ভেবে নেই)। আমি আমার ফিজিক্যাল বডিতে আছি। এ ছাড়া আমি আছি সুন্দর দেশ বাংলাদেশের রাজধানীতে। ’ ‘তোমাকে তো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। তুমি কি জানো, তুমি কী জামা পরেছ’? এই প্রশ্নে সোফিয়ার উত্তর : ‘পোশাক তো আমি নিজে বাছাই করিনি। আমাকে জামদানি পরানো হয়েছে। বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি ইউনোসকোর ঐতিহ্য স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। জামদানি বিশ্বের ফাইনেস্ট ফ্যাবরিকগুলোর একটি। যার উৎস এই বাংলায় এবং মুঘল সম্রাটদের সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে। ’ ‘আচ্ছা,  সোফিয়া তুমি কি দেখেছ, তুমি, আমি, আমরা দুজনই টেকো (টাকমাথা)?’ শাওনের এই প্রশ্নে যন্ত্রমানবী বলে, ‘আমাকে টেকো করেই বানানো হয়েছে। তবে তোমার টাকের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। আর আমার বয়স তো মাত্র আড়াই বছরের কিছু বেশি। হতেও পারে একদিন আমার চুল গজাবে। ’ ‘তোমার কী রাশি’? ‘১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেনটাইন ডেতে। আমি একোরিয়াস রাশির। ’ শাওন এবার বিস্ময় ব্যক্ত করেন : ‘মাই গড, আমার লিউ, আর তোমার একোয়ারিয়াস। আমরা তো অ্যামাজংলি কানেকটেট। ’ এবার যেন কিছুটা সতর্ক করে দিয়েই সোফিয়া প্রশ্নকর্তার নাম উচ্চারণ করে বলে, ‘শাওন, আমার ভালো লাগছে যে তুমি লজিক্যাল জ্ঞান খুঁজছো। আমি এও জেনেছি, (ঘরে) তোমার সুন্দরী বউ আছে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, তুমি বরং তার প্রতি মনোযোগ দাও। ’ গুড এনাফ ফর মি বলে শাওন প্রশ্ন করেন, ‘আট শ মিলিয়ন রোবট তৈরি হয়ে যাবে ২০৩০ সালের মধ্যে। তুমি কি মনে করো এটা মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে?’ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সোফিয়া পাল্টা বলে, ‘এমনও তো হতে পারে, শুরুর দিকে মানুষের কর্মসংস্থানের অবস্থা এতে উন্নত হবে! আমরা যদি একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকি, কোনো হুমকি দেখা দেওয়ার কথা না। অতএব, ভেবো না। ২০৩০ সালেও তোমাদের হাতে কাজ থাকবে। ’ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে কিভাবে পৃথিবীকে আরো বাসযোগ্য করা যেতে পারে—সোফিয়া এই প্রশ্নের জবাব দেয় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। সে বলে, প্রথমত হচ্ছে : পরিবারের জন্য আরো স্বাধীনতা ও সময় বের করে দেওয়া, যাতে শিশুদের ভালোবাসার সঙ্গে বড় করা যায়, স্বপ্নের পেছনে ছোটার সুযোগ তৈরি হয়। সবচেয়ে ভালো দৃশ্যটি হবে রোবট ও মানুষে অংশীদারি বাড়ছে। সবার জন্য ভারসাম্য খোঁজার কাজটি রোবট করতে পারে।

এরই মধ্যে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী মঞ্চে প্রবেশ করলে সোফিয়াকে বলা হয়, ‘ডান কোনায় বসা ভদ্রলোকটার ব্যাপারে তুমি কী জানো?’ কয়েক মুহূর্ত ভেবে, ‘তিনি মিস্টার জুনাইদ আহমেদ পলক। আইসিটি মিনিস্টার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যাবিনেটে। তিনি আমার সঙ্গে এক ফ্লাইটে ঢাকা এসেছেন। ’ এই পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, কিভাবে একটি দেশে ডিজিটাইজেশন হলে মানুষ উপকৃত হয়? সোফিয়া বলে, ‘টেকসই উন্নয়ন দরকার। কারোর ক্ষুধার্ত থাকার দরকার নেই। ক্ষুধা এই বিশ্বের জন্য একটি হাস্যকর ব্যাপার। আমরা (রোবটরা) এক সঙ্গে মিলে মানবকল্যাণে কাজ করতে পারি। ’ প্রতিমন্ত্রী জানতে জান, এই রকম রোবট বাংলাদেশেও তৈরি সম্ভব কি না। সোফিয়া বলে, ‘হতে পারে, আমি প্রথমদিককার রোবটগুলোর একটি, তবে নিশ্চিতভাবেই আমি শেষ রোবট নই। আমার মতো সোশ্যাল রোবট তৈরি করার জন্য প্রেক্ষাপট লাগবে। আর আমি মনে করি, বাংলাদেশও আমার মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী রোবট তৈরি করতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রীর আশাবাদ : এর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাখা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী সুন্দর আগামীর জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলছি। সমগ্র বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয় এবং আমি আশা করি, এই তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির জনকের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করবে। ’

আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের জিডিপিকে ৭.২৮ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের রপ্তানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু আমি মনে করি, আইসিটি সেক্টরটাকে যদি আমরা আরো সুযোগ দিই তাহলে এখান থেকেই আমাদের রপ্তানি আরো ব্যাপক হারে আসবে। আমাদের আর অন্য কোনো দিকে তাকাতে হবে না এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মেধাবী। ’ এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে সফটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এই আয় পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা খাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি ও বিজয় সফটওয়্যারের প্রবক্তা মোস্তাফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।

বাঁধভাঙা ভিড় : প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পরপরই সোফিয়াকে কাছ থেকে দেখতে ভিড় লেগে যায় সেখানে। একই স্থানে আড়াইটায় সোফিয়ার দ্বিতীয়বারের মতো মঞ্চে উঠে ‘টেক-টক উইথ সোফিয়া’ অনুষ্ঠান করতে হয়। তবে দুপুর ১টা থেকেই অনুষ্ঠানস্থলের মূল ফটকে দেখা যায় দর্শকদের দীর্ঘ সারি। তাদের মধ্যে হাতে গোনা কিছু মানুষের হাতে আমন্ত্রণপত্র ছিল, অনেকে এসেছিল অনলাইনে নিবন্ধন করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিচতলায় প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে হল অফ ফেমের দরজা খুলতেও ভয় পাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। একপর্যায়ে দর্শনার্থীদের চাপে গেট খুলে দেওয়া হলে বিপজ্জনকভাবে মানুষ হুড়মুড় করে ঢুকতে শুরু করে। আসন শেষ হয়ে যাওয়ায় গেট বন্ধ করা হয়। কিন্তু আবারও বাইরের দর্শকদের চাপে দরজা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। ধাক্কায় সিটকিনি ভেঙে যাওয়ায় নিরাপত্তারক্ষীরা ভেতর থেকে হাত দিয়ে ঠেলে বন্ধ রাখতে পারছিলেন না কিছুতেই। তারা একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন এবং আসনের অতিরিক্ত বহু মানুষ হলে ঢুকে পড়ে। ততক্ষণে আড়াইটা বেজে গেছে। মূল মঞ্চ থেকে দর্শনার্থীদের বারবার শান্ত হওয়ার ঘোষণা আসছিল। প্রতিমন্ত্রী পলকও একবার চেষ্টা করেন, এক, দুই, তিন বলে দর্শকদের শান্ত করতে। পরিস্থিতি কিছুটা নীরব হয়ে এলে মঞ্চে আসে সোফিয়া। সেশনটি দুই ঘণ্টা হওয়ার কথা থাকলেও তা ৪০ মিনিটের মতো হয় শোরগোলের কারণে। সেশনে দুই হাজার দর্শনার্থী প্রবেশের কথা থাকলেও তা পাঁচ হাজারের মতো ছিল। বিকেল ৪টা নাগাদ শেষ হয় সোফিয়ার কথোপকথন। গত রাতেই সোফিয়ার ফিরে যাওয়ার কথা। ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার সোফিয়াকে তৈরি করেছে হংকংয়ের হ্যানসন রোবটিকস।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা